Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts

Monday, June 21, 2021

সাদা মনের এক মানুষ ❑ জিয়াউদ্দীন আহমেদ

সাদা মনের এক মানুষ ❑ জিয়াউদ্দীন আহমেদ


সাদা মনের এক মানুষ

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

আমরা পাঁচ ভাই দুই বোন।বড় ভাইয়ের বয়স এখন ৮৪ বছর।সরকারি চাকুরী থেকে অবসর নেয়ার পর থেকেই তিনি ফেনী, জিএমহাট, নুরপুর গ্রামে আছেন।মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমদ যাঁকে নিয়ে আমার আজকের কলাম, তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন এবং অবসর নেন সম্ভবত ২০০১ সনের জানুয়ারি মাসে।চাকুরী ও পদমর্যাদা আকর্ষণীয় হলেও তিনি কখনো আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন না।কারণ চাকুরীর শুরু থেকেই তাঁকে পিতার সংসার ও ভাই-বোনদের পড়ার খরচ যোগাতে হয়েছে।অবশ্য এই খরচে তাঁর আনন্দ ছিলো।আমাদের বাবা ছিলেন গ্রামের একটি মাইনর স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক, তাঁর পক্ষে সব খরচ বহন করা সম্ভব ছিলো না।মহিউদ্দিন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স করে ইন্টারউইং স্কলারশীপ নিয়ে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেন।১৯৬৫ সনে মাস্টার্স শেষ করেই তিনি রেডিও পাকিস্তান করাচিতে অনুবাদকের চাকুরী নেন।কিছুদিন পর রেডিও পাকিস্তানের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে তিনি দেশে এসে ফেনী কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।এই কলেজ থেকেই তিনি পাকিস্তান সুপারিয়র সার্ভিসে পরীক্ষা দিয়ে ১৯৬৭ সনে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন, প্রশিক্ষণ শেষে তাঁর প্রথম পোস্টিং হয় লণ্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসে।

একাত্তরের পহেলা আগস্টে তিনি পাকিস্তান দূতাবাস ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেন।মুক্তিযদ্ধের শুরুতেই তিনি বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করার ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন।কিন্তু বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীর অভিমত ছিলো, আনুগত্য স্বীকারের সময় তখনো হয়নি।ফলে তাঁকে আগস্ট মাস পর্যন্ত বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীর সবুজ সঙ্কেতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে।তবুও ইউরোপে তিনিই প্রথম বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেন।লণ্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে হাজার হাজার বাঙ্গালীর মুহুর্মুহু শ্লোগানের ভেতর মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।তাঁর আনুগত্য ঘোষণার এই উৎসবমুখর ঘটনার মনোরম বর্ণনা রয়েছে সুনীল গঙ্গাপাধ্যায়ের ‘পূর্ব পশ্চিম’ উপন্যাসে।পাকিস্তান দূতাবাসের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে কোথায় কিভাবে থাকবেন, কিভাবে খাবেন তা তাঁর মাথায় ছিলো না, মাথায় ছিলো শুধু মুক্তিযুদ্ধ।সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর মাথা গোঁজার কোন ঠাঁই ছিলো না, হাতে টাকা ছিলো না, কিন্তু এই সকল সমস্যা তাঁকে আনুগত্যের ঘোষণা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।কারণ তিনি পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি ছিলেন ক্ষুব্ধ, করাচিতে পড়াশুনা করতে গিয়ে তিনি বাঙ্গালীদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বন্ছনা ও শোষণের প্রকৃত চিত্র দেখতে পেয়েছিলেন।এছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলে সক্রিয়ভাবে ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে তিনি লণ্ডনে বসে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কাজ করতে থাকেন।যাদের আত্মীয়-স্বজন তখন পশ্চিম পাকিস্তানে থাকতেন তারা জানেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা লণ্ডনের মাধ্যমে দেশে চিঠিপত্র পাঠাতেন, আমার এই মেজো ভাইই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাওয়া চিঠিপত্র বাংলাদেশে প্রেরণের ব্যবস্থা করতেন।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনিই আবার ১৯৭৩ সনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত বাঙ্গালীদের দিল্লী বিমানবন্দরে রিসিভ করে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।এই বিমানবন্দরে তিনি পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত রিয়াজ রহমানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের আক্রোশ থেকে রক্ষা করেছিলেন; অথচ রিয়াজ রহমান পররাষ্ট্র সচিব থাকাকালীনই আমার এই মেজো ভাই চাকুরীচ্যুত হন। পাকিস্তানের প্রতি অনুগত রিয়াজ রহমান পরবর্তীতে বিএনপি আমলে পররাষ্ট্র সচিব এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন।

বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মহিউদ্দিন আহমদকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করা হয়।খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই বিএনপি’র একদল সাংসদ নিউইয়র্কে সরকারি সফরে যান, তাদের মধ্যে নোয়াখালীর জিয়াউল হক জিয়াও ছিলেন।তিনি মেজো ভাইয়ের অফিসে গিয়ে দুটি ছবি দেখে ঢাকায় এসে বিএনপি সরকারের কাছে নালিশ করেন; নূর হোসেনের বুক-পিঠে লেখা সেই বিখ্যাত ছবিসহ বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের পাশে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার গোমটা টানার অপরূপ দৃশ্য সম্বলিত ঐতিহাসিক ছবিটি তাঁর অফিস কক্ষে টাঙ্গানো ছিলো।এই দুটি ছবি রাখার অপরাধে চাকুরীর পঁচিশ বছর পূর্তিতে বিএনপি সরকার তাঁকে চাকুরী থেকে অব্যাহতি দিয়ে দেয়; তিনি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন।পরবর্তীতে ১৯৯৬ সনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মামলা প্রত্যাহার করার শর্তে তাঁকে চাকুরীতে পুনর্বহাল করা হয়।

তিনি মুক্তিযোদ্ধা চাকুরিজীবী হিসেবে সরকার প্রদত্ত দুই বছরের এন্টিডেইটেড সুবিধা গ্রহণ করেননি, এমন কি তিনি বহু বছর মুক্তিযোদ্ধা সনদ এবং ভাতাও নেননি।মাত্র দুই/তিন বছর পূর্বে তিনি মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে ভাতা গ্রহণ শুরু করন।ভাতা গ্রহণের ব্যাপারে বন্ধুদের পরামর্শ ছিলো, এই অল্প সন্মানী সরকারকে দিয়ে দিলে সরকারের কোন উপকার হবে না, এই টাকা নিয়ে বরং তাঁর পছন্দানুযায়ী গরীবদের দেয়া হলে তারা উপকৃত হবে; তারা জানতেন, তাদের এই বন্ধুটি সম্পদশালী না হলেও গরীব ও অসহায়দের সম্পদ বিলাতে অকৃপণ।তাঁর গাড়ি নেই, অতিরিক্ত সম্পদ নেই; অবসর গ্রহণের পর তিনি পাবলিক বাসে যাতায়াত করতেন।এখন বয়সের কারণে আর বাসে চড়তে পারেন না, তাঁর বন্ধু সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম বেদুর গাড়ি দিয়ে বা উবারে চলাফেরা করেন।পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলেও তিনি গ্রামের গরীব ও তাঁর বাল্যকালের ঘনিষ্ঠতম নি:স্ব বন্ধুদের প্রতিমাসে অর্থ সাহায্য করে যাচ্ছেন; মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়ার পর থেকে অর্থ গ্রহনেচ্ছু বন্ধুদের নিয়ে তাঁর প্রণীত তালিকা বড় হয়েছে।এছাড়াও তিনি ধর্ষিতা, নির্যাতিত গৃহকর্মী, আগুনে পোড়া ও দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় ও নি:স্বদেরও নিয়মিত অর্থ সহায়তা করে থাকেন।তাঁর জমা অর্থের কিছু আমাকে নমিনি করেছেন যাতে উক্ত টাকার লভ্যাংশসহ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তাঁর করা তালিকা অনুযায়ী তাঁর অবর্তমানে বিলি করতে পারি।

মেজো ভাই শিশুদের খুব পছন্দ করেন, তাঁর বাসায় তিনি ললিপপ, চকোলেট জমা রাখেন- কোন শিশু তাঁর বাসায় গেলেই এগুলো দেন।তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ভালবাসেন, বিবিসি শোনা কখনো বাদ যায় না, বিবিসি শোনার সময় কেউ ফোনে বা অন্য কোনভাবে ডিসটার্ব করলে তিনি বিরক্ত হন।জাতির উদ্দেশ্যে আইয়ুব খানের ভাষণ শোনার জন্য তিনি আমাকে নিয়ে গ্রামের বাজারে ডা. সতীশ দাদার চেম্বারে চলে যেতেন।তিনি মঞ্চ-নাটকের ভক্ত; স্বাধীনতার পর ত্রিশ/চল্লিশ জন নিয়ে তিনি মঞ্চ-নাটক দেখতেন; এত লোক নিয়ে নাটক দেখার দুটি উদ্দেশ্য- নাটককে প্রমোট করা এবং নাটকের প্রতি ছোটদের আগ্রহী করে তোলা।তিনি বইমেলা থেকেও প্রচুর বই কিনেন, তাঁর অনেকগুলো বুকশেলফ রয়েছে।পরিবারের ছোটদের তিনি বইমেলা থেকে বই কেনার জন্য টাকা দেন।তিনি প্রচুর পড়েন; তিনি ঘুমানো ছাড়া বাকী সময় পত্রিকা, ম্যাগাজিন পড়ে সময় কাটান।

আমাদের এই মেজো ভাই এক সময় তাঁর বাড়ীর বিস্তৃত লনে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে নিয়মিত আড্ডা ও গানের আসর বসাতেন; এই আসরে যারা থাকতেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হচ্ছেন সাংবাদিক ওবায়েদ উল হক, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, সাংবাদিক বজলুর রহমান, সাংবাদিক এ বি এম মুসা, ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ড. আনিসুজ্জমান, কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ আবুল মকসুদ, আবুল মাল আবদুল মুহিত, আবদুল গাফফার, মতিয়া চৌধুরী, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, ড. আকবর আলী, মাসুদা ভাট্টি, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি অ্যারমা দত্ত, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গিটারিস্ট এনামুল কবির, ডা: দীপু মনি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউল্লাহ বীরউত্তম, কর্নেল (অব.) জাফর ইমাম বীর বিক্রম, মেজর (অবঃ) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম প্রমুখ।আমার উল্লেখিত ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচমেটদের নাম নেই; তবে সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম বেদু, সাবেক সচিব আব্দুল মতিন, শরবিন্দু শেখর চাকমা এবং তাঁর ফেনী কলেজ-ছাত্র গেদুচাচা খ্যাত সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার মোজাম্মেল হকের নাম উল্লেখ করতে হয়।এই অনুষ্ঠানে ১৯২৭ সনে জন্ম নেয়া ইসলাম বিষয়ে পণ্ডিত ও কলাম লেখক সা’দ উল্লাহ সাহেব যখন ‘ভুবনেশ্বর হে, মোচন কর বন্ধন সব মোচন কর হে’ অথবা তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা’ রবি ঠাকুরের গান কণ্ঠে তুলতেন তখন সবার কণ্ঠ থেমে যেত।মেজো ভাইয়ের স্ত্রী বিলকিস মহিউদ্দিন এবং আমার মেয়ে সানজানা ফারিয়াল ঐশীর গানও থাকতো এই সকল অনুষ্ঠানে।

মেজো ভাই দেশের উল্লেখযোগ্য দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রায় পনের শত কলাম লিখেছেন।দৈনিক সংবাদের সাথে তাঁর রয়েছে আত্মিক সম্পর্ক; বজলুর রহমান সাহেব থাকতে তিনি নিয়মিত সংবাদে কলাম লিখতেন।তাঁর কলাম খুব জনপ্রিয় ছিলো।তাঁর দুটি অহঙ্কার আছে- এক, মুক্তিযোদ্ধা হিসেব পরিচয় দিতে তিনি অহঙ্কারবোধ করেন; দুই, তিনি অহঙ্কার করেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে।পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সনের ৮ জানুয়ারি লণ্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করলে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর বিরল সুযোগ পেয়েছিলেন আমার এই ভাই।মৃত্যুর কোল থেকে ফেরত আসা বঙ্গবন্ধুকে দেখে মেজো ভাই আবেগায়িত হয়ে উঠলে, বঙ্গবন্ধু তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিলেন, ‘ভয় নেই, আমি এসে গেছি’।বাঙ্গালীর ইতিহাসের অংশ পুরাপুরি অসম্প্রদায়িক জনাব মহিউদ্দিন আহমদ চলতি মাসের ১৯ জুনে আশি বছর বয়সে পদার্পন করেছেন।তাঁর জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ ।

লেখক

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক

ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের

সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com

Monday, June 14, 2021

টিনের বাক্স ও শূন্য হস্তের একজন ডেপুটি গভর্নরের লুপ্ত কথা

টিনের বাক্স ও শূন্য হস্তের একজন ডেপুটি গভর্নরের লুপ্ত কথা



টিনের বাক্স শূন্য হস্তের একজন ডেপুটি গভর্নরের লুপ্ত কথা

সচিব এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান, বারিধারা, উত্তরা, পূর্বাচল, লালমাটিয়া, ডিওএইচএসে অট্টালিকা, প্লট, ফ্ল্যাট থাকে। বাগানবাড়ি থাকে গরু-মহিষের বাথান, চিংড়ি ঘের, রিসোর্ট, ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদি নানান কিছু থাকে। আবার অনেকের নিউইয়র্ক, টরন্টো, দুবাই, সিঙ্গাপুর, হিউস্টনে অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি, মলের মালিকানা থাকে। শাহ আব্দুল হান্নানের কিছুই ছিল না অথচ তিনি শুল্ক ও আবগারি বিভাগের কালেক্টর, দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও ব্যাংকিং বিভাগের সচিব ছিলেন।

তার শেষ ঠাই ছিল পিতা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ভাইবােনদের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় উত্তর গােড়ানে গড়ে তােলা বাড়ি। কয়েক মাস আগে করােনা থেকে আরােগ্য লাভ করলেও গতকাল বুধবার তিনি ইন্তেকাল করেন। শাহ আব্দুল হান্নানের রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে তর্কবিতর্ক থাকতে পারে। তাঁকে নিয়ে আমার এই লেখা। ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণা। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৬৬ বা '৬৭ সালে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনষ্টিটিউট হলে ঈদে মিলাদুন্নবীর এক তানুষ্ঠানে। তখন তিনি চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনে ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন। সে অনুষ্ঠানে যত দূর মনে পড়ে, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান কমােডর আসিফ আলভীও ছিলেন। তারপর ১৯৭৯ সালে আমি নিজে শুষ্ক ও আবগারি বিভাগে যােগ দিই। এর কিছুদিন আগেই আমি বিয়ে করি। খালাশাশুড়ির বাসায় বিবাহােত্তর দাওয়াত খেতে টেবিলে তিনি কথায় কথায় বললেন, 'আমাদের বুলবুলের (হান্নান ভাইয়ের স্ত্রী) জামাইও তাে কাস্টমসে চাকরি করে।' আমার স্ত্রী শুনে বললেন, ‘হান্নান সাহেব যে বুলবুল আপার জামাই তা তাে জানি, কিন্তু তিনি যে কাস্টমসে কাজ করেন, তা তাে জানতাম না। যাহােক, আমি চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনে পদস্থ হই। পরবর্তীকালে ঢাকা শুল্ক, আবগারি, কালেক্টরেটে তার অধীনে কাজ করি। এ সময় আমাদের সম্পর্ক উর্ধ্বতন-অধস্তন কর্মকর্তায় সীমাবদ্ধ ছিল। আমাদের দুজনের ওপরই এ সময় ঢাকা এয়ার ফ্রাইটে ঘড়ি চোরাচালান নিয়ে বেশ ঝড় ঝাপটা যাচ্ছিল।

কিছুদিন পর আমি বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য চলে যাই এবং এসে জাতীয় রাজস্ব বাের্ডে যােগ দিই। তখন তিনি জাতীয় রাজস্ব বাের্ডের সদস্য। একদিন বললেন, 'বিয়ের পর তােমাদের বাসায় খেতে ডাকা হয়নি। তোমাদের আপা আগামী শুক্রবার দুপুরে খেতে বলেছেন।' সদ্য যুক্তরাষ্ট্র ফেরত, আমরা সামান্য কিছু উপহার নিয়ে তাঁদের ইস্কাটনের সরকারি বাসায় যাই। খাবার টেবিলে বুলবুল আপা খানিকটা অনুযােগের স্বরে হান্নান ভাইকে বললেন, 'দেখাে, কবির ভাই (আমি) কেমন আমার বােনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক বছর থেকে এলে তুমিও তাে একই বিভাগে কাজ করাে, তােমার এত দিন চাকরি হলাে, তুমি তাে আমাকে কোথায় নিয়ে গেলে না!' হান্নান ভাই বললেন, ‘কবির ব্রিলিয়ান্ট অফিসার, ওর কথা আলাদা!' আমতা আমতা করে একটা জবাব দিয়ে বিষয়টি এড়াতে চাইলেন। স্ত্রী তাে দূরের কথা, অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ হান্নান ভাইয়ের সরকারি কাজে বিদেশে যেতেও প্রবল অনীহা ছিল।

জাতীয় রাজস্ব বাের্ডের সদস্য হিসেবে ভ্যাট প্রবর্তনের আগে একটি সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে ফিলিপাইন, ভারতসহ কয়েকটি দেশ সফরে গিয়েছিলেন। তাঁর সফরসঙ্গীরা আমাকে বলেছেন, তিনি প্রায়ই হােটেলের মূল খাবার বাদ দিয়ে ফলমূল ও ডেজার্ট খেয়ে থাকতেন। নিজের খাবারের জন্য তিনি দেশ থেকে সঙ্গে কিছু বিস্কুট নিয়ে গিয়েছিলেন।

হান্নান-বুলবুল দম্পতির বিদেশযাত্রী। তার বাসায় বেড়ানোর বছরখানেক পর আমি ব্রাসেলসে ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউসিও) একটি সভায় যােগ দিই। সেখানে তখন আমাদের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন আমার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী মনযুর মান্নান (পরে দুদকের সদস্য)। সেখানে মান্নান ভাইকে খাবার টেবিলে আপার আক্ষেপের কথা তুলে তাঁদের কীভাবে বিদেশে পাঠানো যায়, তা নিয়ে আলাপ করি। মান্নান ভাই বললেন, হান্নান ভাইয়ের স্ত্রীর আক্ষেপ সঠিক। সার্ভিসের আমরা সবাই নিজেও স্ত্রীসহ নানান দেশে সফর করেছি। আমরা দুজন আলাপ করে স্থির করি, ডৱিউসিওর মহাসচিব জাতীয় রাজস্ব বাের্ডের চেয়ারম্যান শাহ আবদুল হান্নানকে ব্রাসেলসে তাদের সদর দপ্তর ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানাবেন। ডব্লিউসিও তার সফরের সব ব্যয়ভার বহন করবে।

হান্নান-বুলবুল দম্পতি মান্নান ভাইয়ের বাসায় তাঁদের সঙ্গে থাকবেন। এই সুযােগে মিসেস হান্নান। একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। তবে নিমন্ত্রণপত্রটি আমার ঠিকানায় পাঠানাে হবে না হলে হান্নান সাহেবের হাতে সরাসরি গেলে তিনি না করে দেবেন। আমি তাদের সস্ত্রীক সফরে প্রধানমন্ত্রীর অনুমােদনের জন্য সারসংক্ষেপ তৈরি করে আমাদের নতুন চেয়ারম্যান শাহ আবদুল হান্নানের কাছে নিয়ে যাই। তিনি কোনােমতেই সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করতে রাজি হচ্ছিলেন না। এ সময় মান্নান ভাইও ব্রাসেলস থেকে তাকে ফোন করে বারবার আমন্ত্রণটি গ্রহণ করার জন্য অনুরােধ করেন। প্রায় এক ঘন্টা বসে থেকে, তর্কবিতর্ক করে, শেষমেশ বিরক্ত হয়ে তিনি সই করলেন। আমি সারসংক্ষেপ হাতে হাতে নিয়ে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া স্যারের কাছে যাই। তিনি কেবল একটি কথাই জিজ্ঞেস করলেন, 'হান্নান সাহেব কি বিদেশে যাবেন? তাকে তাে যখনই বিদেশ যাওয়ার কথা বলি, তিনি না করেন। আমি অর্থমন্ত্রীকে সবকিছু খুলে বললাম এবং জানালাম, অনেক কষ্টে আমি রাজি করিয়েছি। অর্থমন্ত্রী কী একটা কাজে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাচ্ছিলেন। বললেন, সারসংক্ষেপ তিনি নিয়ে যাবেন।

পরদিনই প্রধানমন্ত্রীর অনুমােদনসহ সারসংক্ষেপ চেয়ারম্যানের কাছে ফিরে এলে আমার ডাক পড়ে। আগেরবার রাগের মাথায় পুরাে সারসংক্ষেপ পড়েননি। এবার পড়েছেন, বললেন, 'ব্রাসেলসে তােমার আপার কাজ কী? তাঁর বিমান ভাড়া, থাকা-খাওয়ার খরচ কে দেবে?' আমি বললাম, 'বাংলাদেশ বিমান পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে আপনার স্ত্রী ১০ শতাংশ ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারেন। আর ব্রাসেলসে আপনারা মান্নান ভাইয়ের বাসায় থাকবেন।' তিনি নিমরাজি হলেন। সমস্যা হলাে, তাদের বাসায় বিদেশে যাওয়ার কোনাে ভালাে ব্যাগ নেই। টিনের বাক্স আছে, তা নিয়ে তাে আর ব্রাসেলসে যাওয়া যায় না! আমরা সদ্য বিদেশ ফেরত। সুটকেস, ট্রলি সবই আমাদের আছে। তাদের বাসায় পৌছে দিলাম। আমাদের পরিকল্পনা সফল হলাে, হান্নান-বুলবুল দম্পতি বিদেশ সফর করে ফিরে এলেন।

উত্তর গোড়ান থেকে অনেকবার আমি এবং অন্য অনেকে তাকে রাজউকের জমির জন্য আবেদন করতে বলেছেন। তিনি বারবারই বলেছেন, 'ঢাকায় আমার এজমালি হলেও একটি পৈতৃক সম্পত্তি আছে। আমি মিথ্যা ঘােষণা স্বাক্ষর করতে পারব না। তা ছাড়া আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়ার ও কিস্তির ঢাকাই-বা আমি কোথা থেকে দেব?' আমরা রাজউকের দুজন চেয়ারম্যান ও পূর্তসচিবকে তাঁকে বলতে শুনেছি, 'স্যার, আপনি কেবল আবেদন করেন। বাকিটা আমরা দেখব।' তিনি কোন মতেই রাজি হননি। আর্থিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার যে নজির শাহ আবদুল হান্নান রেখে গেছেন, তা বিরল।

আমি ক্ষণজন্মা এই মানুষটির আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তাঁদের সন্তান ইমু ও ফয়সালের প্রতি সমবেদনা। তাদের বলি, এমন একজন মানুষকে পিতা হিসেবে পাওয়া যেকোনো সন্তানের জন্য একটি বিরল সম্মান। আর নিজেদের বলি, এমন একজন সরকারি কর্মকর্তা পাওয়া একটি জাতির জন্য ভাগ্যের বিষয়।

 

- লেখক: মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান

সাবেক সচিব ও অর্থনীতিবিদ।

তথ্যসূত্রঃ https://www.facebook.com/groups/545777542768229/permalink/759239744755340/?sfnsn=mo 

 

Sunday, June 13, 2021

বাজেট ২০২১-২০২২ এবং আমাদের ভাবনা ❑ জিয়াউদ্দীন আহমেদ

বাজেট ২০২১-২০২২ এবং আমাদের ভাবনা ❑ জিয়াউদ্দীন আহমেদ



বাজেট ২০২১-২০২২ এবং আমাদের ভাবনা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।এই বাজেট ২০২০-২১ অর্থবছরে মূল বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা বেশি।নতুন অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং এই অর্থ দ্বারা ১ হাজার ৫১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, বনায়ন, উপকুল রক্ষা বাঁধ ইত্যাদির সংস্কার, তৈরি, উন্নয়ন ও নির্মাণে উল্লেখিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।করোনায় পর্যদুস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রস্তাবিত উন্নয়ন বাজেটে পূর্ববর্তী বাজেটের চেয়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে।করোনায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে স্থবিরতা এসেছে তাতে গতি সৃষ্টি করার জন্য, অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য আনার লক্ষ্যে সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে ঋণের ব্যবস্থা করে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া মতামত ব্যক্ত করে না, কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বাজেটের বিরুদ্ধে কি বলবে তা বাজেট ঘোষণার আগেই ঠিক করে রাখে।আমার বাজেট সম্পর্কে বোধশক্তি জন্মানোর পর থেকেই এই অদ্ভুত রীতি দেখে আসছি।বাজেট পড়ে ধীরে সুস্থ্যে মতামত দেয়ার ধৈর্য কারো নেই।সংসদেও একই চেহারা; সাংসদদের বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা করতে দেখা যায় না, বাজেটের বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্টভাবে নতুন প্রস্তাব দেয়ার জন্য কেউ বাজেট পড়ার পরিশ্রম করেন বলে মনে হয় না।বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সভাপতি মোহাম্মদ ফরহাদ বাজেট পর্যালোচনায় একবার সংসদে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের পুনর্বিন্যাস করে সুবিন্যস্ত একটি নতুন বাজেট পেশ করেছিলেন, খাতওয়ারি সংশোধনের বিশদ প্রস্তাব উপস্থাপনের জন্য দীর্ঘ সময় দিতে স্পিকার সম্মত না হলে অন্যান্য সাংসদেরা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সময় কমরেড ফরদানকে দিয়ে দেন।এবার কেউ কেউ যমুনা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদি বড় বড় প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ করে দিয়ে বা বরাদ্দ কমিয়ে দিয়ে করোনা উত্তর পরিস্হিতি মোকাবিলায় অর্থ খরচের পরামর্শ দিয়েছেন।কিন্তু এই প্রকল্পগুলোর কাজে স্থবিরতা এলে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাবে, পরবর্তীতে কয়েকগুণ বেশী অর্থ খরচ করেও সুচারুভাবে প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না।

দেশের অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে বড় বড় কোম্পানির কর হার ২% কমানো হয়েছে।বাজেট প্রণেতাদের ধারণা, কর হার কমানো হলে কর্পোরেটগুলো অধিকতর বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে এবং এতে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্হানের সৃষ্টি হবে।অবশ্য ছোট ব্যবসায়ীদের কর হারও বর্তমানের চেয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কর আদায়ের জটিল প্রক্রিয়া-পদ্ধতি এবং দুর্নীতির বেড়াজালের কারণে সরকারের প্রত্যাশিত আয় সব সময় হয় না।আমদানী শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর থেকে আদায় কোন কারণে বাধাগ্রস্ত হলে সরকারকে ব্যয় কমাতে হয়, অথবা ঋণ করে বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে হয়।কিন্তু কিছু ব্যয় আছে যা হ্রাস করা যায় না, সরকারের কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি পরিশোধ করতেই হয়।ব্যয় কমানো যায় শুধু উন্নয়ন বাজেট থেকে।২০২১-২২ অর্থ বছরেও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.২%। করোনার মধ্যে এই উচ্চ মাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয় বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন; বিশ্ব ব্যাংকের অভিমত হচ্ছে ৫.১% এর বেশী হবে না।কিন্তু চলতি বছরে যে প্রবৃদ্ধি(৫.৩%) বাংলাদেশ অর্জন করেছে তা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।দেশের এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে, দেশের উন্নয়নে ব্যয় না করলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে যাবে, উন্নয়নে ব্যয় না হলে মেট্রোরেল হবে না, পদ্মাসেতু হবে না, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে না, নতুন ভবন হবে না, নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে না, করোনা রোগীর জন্য নতুন শয্যার সংযোজন হবে না, কর্মহীনদের বেকারত্ব যাবে না।

স্বাস্থ্যখাতে অধিক বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তার কথা অর্থনীতিবিদেরা বারবার বলছেন।স্বাস্থ্যখাত নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন, অনেকেই মনে করছেন, এই খাতে এবার প্রয়োজনানুযায়ী বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি।কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে গতবারের তুলনায় ৩ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।এছাড়াও করোনা মোকাবিলায় এবারও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা।স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি নিয়ে জনগণ বীতশ্রদ্ধ, তাই এই খাতে বরাদ্দের পরিমাণ মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার।শিক্ষাখাতে কাঙ্খিত বরাদ্দ কোন সরকারের আমলেই ছিলো না; প্রতি বছরই শিক্ষাখাতে কম বরাদ্দের জন্য বাজেট সমালোচিত হয়ে থাকে।গতবারের তুলনায় এবার ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা।বরাদ্দের এমন বৃদ্ধি প্রায় সব খাতেই হয়েছে।বহু নতুন ব্যবসা ও নতুন শিল্পকে কর রেয়াত দেয়া হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে তৈরি ইলেকট্রনিক সামগ্রীর জন্য কর সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির কাঁচামালের শুল্ক হার কমানো হয়েছে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে উপবৃত্তি বাড়ানো হয়েছে, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ১২ হাজার থেকে বৃদ্ধি করে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, বাজেটে আরও ৮ লক্ষ লোককে বয়স্ক ভাতা দেয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, সব মন্ত্রণালয়ই প্রতি বছর বেশী বেশী বরাদ্দের চাহিদা পেশ করে থাকে, কিন্তু অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ই প্রদত্ত বরাদ্দের সম্পূর্ণ খরচ করতে পারে না।ব্যয় না হওয়ার পেছনেও যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।বাজেট পাস হওয়ার সাথে সাথে অর্থ মন্ত্রনালয় থেকে বরাদ্দের ছাড়করণ হয় না; কারণ বছরব্যাপী যে কর, শুল্ক ইত্যাদি আদায় হয় তা থেকেই বিভিন্ন খাতে প্রদত্ত বরাদ্দের অর্থের যোগান দিতে হয়।বরাদ্দের অর্থ পাওয়ার পর সংগ্রহ নীতিমালার দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করতে করতেই বছরের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যেতে হয়।তাই ব্যয়-সংশিষ্ট কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করার অনুকূল পরিবেশ না থাকলে বা বরাদ্দ সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড সম্পাদনে লোকবলের সক্ষমতার অভাব হলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা আসবেই।হলি আর্টিজানে জাপানি বিশেষজ্ঞদের নির্মমভাবে হত্যার পর মেট্রোরেল নির্মাণ বহুদিন বন্ধ ছিলো।এমন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করা সহজ নয়।কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মচারী-কর্মকর্তার অজ্ঞতা, অক্ষমতা বা কাজের প্রতি অনীহার কারণে প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়া ক্ষমার অযোগ্য।অথর্ব লোকদের সততাও অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হয়।অনেক সৎ লোক আছেন যারা কোন দায়িত্ব নেন না, যথাসময়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না।এই লোকগুলো দুর্নীতিবাজের চেয়েও বেশী পরিত্যজ্য।সততা এবং কর্মদক্ষতা দুটিই কর্ম সম্পাদনের জন্য অপরিহার্য।

বহুল কথিত কালো টাকাকে সাদা করার সুবিধা প্রস্তাবিত বাজেটে রাখা হয়েছে কী না, রাখা হলেও তা কিভাবে রাখা হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি।সম্পদের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ না রেখে শুধু ১০% কর দিয়ে কালো টাকাকে সাদা করার সুযোগ বহু বছর যাবত দেয়া হচ্ছে।কিন্তু ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, এই সুযোগ গ্রহণ করেই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কালো টাকাকে সাদা করেছেন। বর্তমান অর্থমন্ত্রী এই অর্থকে কালো টাকা বলতে নারাজ, তার কথা অনুযায়ী এই টাকা অপ্রদর্শিত আয় থেকে উদ্ভুত।প্রকৃতপক্ষে অপ্রদর্শিত বৈধ আয় পরবর্তী কোন একটি আয়কর বিবরণীতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রাখা খারাপ কেন তা বোধগম্য নয়।এক্ষেত্রে স্বাভাবিক কর হার ছাড়াও জরিমানা আরোপের ব্যবস্থা থাকলে কারো অভিযোগ থাকার কথা নয়।ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেছেন, করোনার কারণে সৃষ্ট মন্দা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে শুল্ক ও করকাঠামো সংস্কার করে বিনিয়োগবান্ধব ও উৎপাদনশীল রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করা জরুরী।ব্যবসা বান্ধব নীতি-পদ্ধতির কথা সভা, সেমিনারে অহর্নিশ উচ্চারিত হলেও তা নীতি নির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে না, করজাল বাড়ানোর গুরুত্ব উপলব্ধি করা সত্বেও তা বাস্তবায়নে গড়িমসির কারণ অজ্ঞাত, ভ্যাট আদায়ে ইলেকট্রনিক মেশিনের ব্যবহার সর্বত্র প্রচলন না করার কারণও অজানা।

দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন বা টাকশাল কয়েকবার শীর্ষ দশ করদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলো, প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধান হিসেবে আমাকে কয়েকবার ভিআইপি কার্ডও প্রদান করা হয়।তখন বিস্মিত হয়ে দেখতাম, হাকিমপুরী জর্দা প্রস্তুতকারক প্রতিবারই শ্রেষ্ঠ করদাতা হিসাবে অর্থমন্ত্রীর হাত থেকে ক্রেস্ট নিচ্ছেন।দেশে এত বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যাদের প্রভাব প্রতিপত্তি নিয়ে মুখরোচক গল্পের প্রচলন রয়েছে তাদের আয় একটি জর্দা কোম্পানির চেয়ে কম- বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো।সম্পদশালী ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি এবং সরকারের আমলারা বিদেশে ‘বেগমপাড়া’ গড়ে তোলার টাকা পান কই? সরকারের প্রাপ্য কর ও শুল্ক আদায় হচ্ছে না; কর ফাঁকি দিচ্ছেন একজন, কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন আরেকজন।তারপরও বাংলাদেশ ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট থেকে ৬ লাখ কোটি টাকার বাজেটে পৌঁছতে পেরেছে, এই অর্জন কম নয়।

লেখক

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক

ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের

সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com

Sunday, June 6, 2021

ইসরাইলে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং আমাদের ভাবনা ❑ জিয়াউদ্দীন আহমেদ

ইসরাইলে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং আমাদের ভাবনা ❑ জিয়াউদ্দীন আহমেদ

ইসরাইলে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং আমাদের ভাবনা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

মেশিন রিডেবল পাসপোর্টে নিষেধাজ্ঞার কথা লেখা থাকলেও সম্প্রতি নতুন ছাপানো ই-পাসপোর্টে ‘ইসরাইল ছাড়া সব দেশ’ এই কথাটি বাদ দেয়া হয়েছে।নতুন পাসপোর্ট ব্যাপকভাবে এখনো ইস্যু না হওয়ায় বিষয়টি অনেকের নজর এড়িয়ে গেছে।হামাসের সাথে ইসরাইলের সম্প্রতি লড়াই না বাঁধলে সম্ভবত কেউ বিষয়টি নিয়ে মাথাও ঘামাত না।এই বাদ দেয়ার খবরটি জনগণ জানতে পারে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারো একটা টুইট-বার্তা থেকে।ইসরাইল বাংলাদেশের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে।কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশি পাসপোর্টে ইসরাইল ভ্রমণে আগের মতোই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে।ইসরাইলের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই; বাংলাদেশ ইসরাইলকে স্বীকারও করে না।অপরদিকে জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরে মাহমুদ আব্বাস নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিন সরকারকে বাংলাদেশ স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ঢাকায় তাদের দূতাবাসও রয়েছে।এছাড়াও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পাসপোর্টের গুরুত্বও কম।অনেক দেশের পাসপোর্টে বিনা ভিসায় শতাধিক দেশ ভ্রমণ করা যায়।আমাদের পাসপোর্টে ভিসা থাকার পরও বিভিন্ন দেশের ইমিগ্রেশনে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়।পৃথিবীর অনেক দেশের ইমিগ্রেশনে ইহুদিরা চাকুরী করেন, তারা যখন দেখে আমাদের পাসপোর্টে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কিছু লেখা আছে তখন ঐ ইমিগ্রেশন-অফিসার বাংলাদেশী যাত্রীর প্রতি সদয় থাকে না।এছাড়াও যে দেশকে বাংলাদেশ স্বীকারই করে না সেই দেশের কথা পাসপোর্টে লিখে রাখা অর্থহীন ও বোকামি।

ইসরাইলের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম জগতে একটা নতুন চিন্তা-ভাবনার উন্মেষ ঘটেছে।মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি আরব দেশ ইসরাইলের সঙ্গে তাদের বৈরি অবস্থানের অবসায়ন চায়।মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর কয়েকটির ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন এলেও পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখনো অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রই দেখে থাকে।কিন্তু এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব হবে যখন ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা অনুমোদন করবে।কারণ তেয়াত্তর বছর ধরে ইসরাইলের অস্তিত্ব অস্বীকার করেও কোন লাভ হয়নি; যতবারই ইসরাইলের সাথে ফিলিস্তিন ও মুসলিম দেশগুলো লড়তে গেছে ততবারই ভূমি হারিয়েছে।এই অবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার দূতিয়ালি করে কিছু দেশকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছে যে, এভাবে ইসরাইলের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কখনো সম্ভব হবে না, বরং ইসরাইলকে মেনে নিয়েই মুসলিম দেশগুলোকে এগুতে হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো, সুদান ও বাহরাইন সম্প্রতি ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছে।অবশ্য ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরপরই মুসলিম দেশ তুরস্কের সাথে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।১৯৪৮ সনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক বছর পরই তুরস্ক ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়।ইসরাইলে রপ্তানিকারক শীর্ষ ১০ দেশের একটি তুরস্ক; অথচ ইসরাইলের বিরুদ্ধে এখন বেশী সোচ্চার তুরস্ক, বিষয়টি মনে হয় রাজনৈতিক।আরব বিশ্বে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং নিজ দেশে ইসলামপন্থীদের দলে টেনে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর লক্ষ্যে এরদোয়ান সাম্প্রতিক সময়ে ঘোর ইসরাইল বিরোধী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। জর্ডান ও মিশরের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক বহু বছর আগে থেকেই।১৯৭৩ সনের যুদ্ধে ইসরাইলকে কাবু করতে ব্যর্থ হয়ে মিশর ক্যাম্পডেভিট চুক্তি করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৭৯ সনে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।জর্ডান এই সম্পর্ক স্থাপন করে ১৯৯৪ সনে।আরব লীগের সদস্য মৌরিতানিয়া ১৯৯৯ সনে ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও ২০১০ সনে আবার সম্পর্কচ্ছেদ করে।সৌদি আরবের সাথে ইসরাইলের একটি গোপন আঁতাত গড়ে উঠার কথা সবাই বিশ্বাস করে।ভেতরে ভেতরে যত যোগাযোগই থাকুক না কেন, ইসরাইলকে এক্ষুণি স্বীকৃতি দিয়ে মুসলিম বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার মোড়লগিরির পদ হারাতে চাইবে না সৌদি আরব।

সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শেখ হামাদ ৯২ মিলিয়ন ডলার বা ৭৮০ কোটি টাকা দিয়ে ‘বেইতার জেরুজালেম’ নামের একটি ইসরাইলি ফুটবল ক্লাবের অর্ধেক শেয়ার কিনে নিয়েছেন।ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামেন নেতানিয়াহু এই ক্লাবটির সমর্থক, আর এই ক্লাবের উগ্র সমর্থকগোষ্ঠী আরবদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে।মুসলমান বিদ্বেষী এমন একটি ফুটবল ক্লাব ক্রয় করার পরও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনগণের কোন উচ্চবাচ্য নেই।ভারত দীর্ঘদিন ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের বিপক্ষে ছিলো এবং এই কারণেই ভারতের সাথে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিলো না, সম্প্রতি মোদি সরকার সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।এই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের কারণে ভারতের সাথে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর সম্পর্কের সামান্যতম অবনতিও হয়নি।অবশ্য স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইলে বরং মুসলিম দেশগুলো একঘরে হয়ে যাবে।কারণ জাতিসংঘের ১৯৩ দেশের মধ্যে ১৬৪টি দেশ ইতোমধ্যে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ইসরাইল প্যালেস্টাইন অঞ্চলে যা হচ্ছে তেমন ঘটনা পৃথিবীর আরো নানা প্রান্তেও হচ্ছে। ফিলিস্তিনের জনগণের উপর ইসরাইলের নির্যাতনের জন্য কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা না গেলে একই যুক্তিতে বাংলাদেশর উচিত কাশ্মীরের জনগণের দুর্দশার কথা ভেবে ভারতের সাথে, বেলুচিস্তানের জনগণের কথা ভেবে পাকিস্তানের সাথে, কুর্দি জনগণের প্রতি দয়ার্দ হয়ে ইরাক, সিরিয়া, তুরস্কের সাথে, রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিয়ানমারের সাথে, উইঘুর জনগোষ্ঠীর পাশে থেকে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা।এমন নির্যাতন পৃথিবীর নানা প্রান্তে আরও হচ্ছে, এখানে শুধু মুসলমান জাতিগুলো থেকেই কয়েকটি উদাহরণ নিলাম।ইসরাইলকে স্বীকৃতি প্রদানকারী তুরস্ক, মিশরসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ যদি ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক রেখেও ফিলিস্তিনের পক্ষে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কড়া বিবৃতি দিতে পারে তাহলে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশের পক্ষেও তা করা সম্ভব।ইসরাইল বাংলাদেশের শত্রু নয়, ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে অস্ত্র এবং অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে চাওয়া দেশটি হল ইসরাইল এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সনের ৪ এপ্রিল ইসরাইল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করলেও বঙ্গবন্ধু তা প্রত্যাখ্যান করেন।মুক্তিযুদ্ধের সময় সৌদি আরব, লিবিয়া প্রভৃতি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে, বাংলাদেশকে নয়।যে মুসলিম দেশগুলোর সমর্থন পাবার জন্য বঙ্গবন্ধু ইসরাইলের সমর্থন নেননি তারা কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর আগে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি।হজ্বে বাধা দেয়ার মতো ধর্ম বিরোধী কাজটি থেকে বিরত রাখতে বঙ্গবন্ধুকে সৌদি বাদশাহের কাছে ছুটে যেতে হয়েছে, কিন্তু সৌদি আরব বাংলাদেশীদের হজ্জ করার সুযোগও দেয়নি।যে ফিলিস্তিনের জন্য মুসলমানেরা একাট্টা সেই ফিলিস্তিনই ইসরাইলের সাথে ইতোমধ্যে সমঝোতা করে ফেলেছে, তাহলে বাংলাদেশ পারবে না কেন? পারবে না, কারণ বাংলাদেশী মুসলমানেরা ‘মিসকিন’ হয়েও মুসলিম উম্মার সাথে রাজনৈতিক আবেগে একাত্ম হওয়ার তীব্র বাসনা পোষণ করে থাকে।

পাকিস্তানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা মাওলানা মুহাম্মদ খান শেরানি স্পষ্ট করে বলেছেন, কোরআন এবং ইতিহাস অনুযায়ী ইসরাইলিরা এখন যে জায়গা দখল করে আছে তা ইহুদিদের জায়গা, ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া পাকিস্তানের উচিত হবে।কোন প্রেক্ষিতে তিনি কোরআনের কথা বলেছেন তার ব্যাখ্যা দেননি।কিন্তু জায়গাটি তো ফিলিস্তিনিদেরও।তাই ইসরাইল রাষ্ট্রের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাষ্ট্র অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।শক্তির জোরে ইসরাইল যদি গোয়ার্তুমি করতেই থাকে, ফিলিস্তিনিদের উপর নির্যাতন চালাতেই থাকে, তাহলে ইহুদিদের ঘৃণা করার ধর্মীয় অনুভূতি থামবে না।ইসরাইলের এমন খারাপ আচরণের জন্যই মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে এখনো একজন আরেকজনকে ‘তুই ইহুদি’ বলে গালি দিয়ে থাকে।

ইসরাইলের প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া বাংলাদেশে লাগেনি।উনপন্চাশ বছর আগে স্বাধীনতা লাভের সময় ইসরাইল ও ফিলিস্তিন সম্পর্কে বাংলাদেশের যে অবস্থান ছিলো এখনো তাই রয়েছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের কূটনৈতিক চাপ না থাকলে বাংলাদেশের এই অবস্থানে শীঘ্র কোন পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না।কারণ বাংলাদেশের জনগণকে সরকারের পক্ষে শান্ত রাখার জন্য ধর্মীয় আবেগকে প্রশ্রয় দেয়া হয় ব্যাপকভাবে।পাকিস্তান আমলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মের এত প্রভাব ছিলো না।সরকার বুঝতে পেরেছে, গোটা মধ্যপ্রাচ্য ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুললেও ফিলিস্তিনিদের অধিকারের ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণ একাট্টা।বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ইসরাইল বিরোধী মনোভাব জোরালো থাকার কারণে ইসরাইল ইস্যুতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং বামপন্থীদের অবস্থান একই বিন্দুতে এসে মিলেছে।

 

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক

ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের

সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com

ahmedzeauddin0@gmail.com

 

Thursday, June 3, 2021

টিনের বাক্স ও শূন্য হস্তের একজন ডেপুটি গভর্নরের লুপ্ত কথা

টিনের বাক্স ও শূন্য হস্তের একজন ডেপুটি গভর্নরের লুপ্ত কথা

টিনের বাক্স শূন্য হস্তের একজন ডেপুটি গভর্নরের লুপ্ত কথা

সচিব এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান, বারিধারা, উত্তরা, পূর্বাচল, লালমাটিয়া, ডিওএইচএসে অট্টালিকা, প্লট, ফ্ল্যাট থাকে। বাগানবাড়ি থাকে গরু-মহিষের বাথান, চিংড়ি ঘের, রিসোর্ট, ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদি নানান কিছু থাকে। আবার অনেকের নিউইয়র্ক, টরন্টো, দুবাই, সিঙ্গাপুর, হিউস্টনে অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি, মলের মালিকানা থাকে। শাহ আব্দুল হান্নানের কিছুই ছিল না অথচ তিনি শুল্ক ও আবগারি বিভাগের কালেক্টর, দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও ব্যাংকিং বিভাগের সচিব ছিলেন।

তার শেষ ঠাই ছিল পিতা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ভাইবােনদের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় উত্তর গােড়ানে গড়ে তােলা বাড়ি। কয়েক মাস আগে করােনা থেকে আরােগ্য লাভ করলেও গতকাল বুধবার তিনি ইন্তেকাল করেন। শাহ আব্দুল হান্নানের রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে তর্কবিতর্ক থাকতে পারে। তাঁকে নিয়ে আমার এই লেখা। ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণা। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৬৬ বা '৬৭ সালে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনষ্টিটিউট হলে ঈদে মিলাদুন্নবীর এক তানুষ্ঠানে। তখন তিনি চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনে ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন। সে অনুষ্ঠানে যত দূর মনে পড়ে, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান কমােডর আসিফ আলভীও ছিলেন। তারপর ১৯৭৯ সালে আমি নিজে শুষ্ক ও আবগারি বিভাগে যােগ দিই। এর কিছুদিন আগেই আমি বিয়ে করি। খালাশাশুড়ির বাসায় বিবাহােত্তর দাওয়াত খেতে টেবিলে তিনি কথায় কথায় বললেন, 'আমাদের বুলবুলের (হান্নান ভাইয়ের স্ত্রী) জামাইও তাে কাস্টমসে চাকরি করে।' আমার স্ত্রী শুনে বললেন, ‘হান্নান সাহেব যে বুলবুল আপার জামাই তা তাে জানি, কিন্তু তিনি যে কাস্টমসে কাজ করেন, তা তাে জানতাম না। যাহােক, আমি চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনে পদস্থ হই। পরবর্তীকালে ঢাকা শুল্ক, আবগারি, কালেক্টরেটে তার অধীনে কাজ করি। এ সময় আমাদের সম্পর্ক উর্ধ্বতন-অধস্তন কর্মকর্তায় সীমাবদ্ধ ছিল। আমাদের দুজনের ওপরই এ সময় ঢাকা এয়ার ফ্রাইটে ঘড়ি চোরাচালান নিয়ে বেশ ঝড় ঝাপটা যাচ্ছিল।

কিছুদিন পর আমি বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য চলে যাই এবং এসে জাতীয় রাজস্ব বাের্ডে যােগ দিই। তখন তিনি জাতীয় রাজস্ব বাের্ডের সদস্য। একদিন বললেন, 'বিয়ের পর তােমাদের বাসায় খেতে ডাকা হয়নি। তোমাদের আপা আগামী শুক্রবার দুপুরে খেতে বলেছেন।' সদ্য যুক্তরাষ্ট্র ফেরত, আমরা সামান্য কিছু উপহার নিয়ে তাঁদের ইস্কাটনের সরকারি বাসায় যাই। খাবার টেবিলে বুলবুল আপা খানিকটা অনুযােগের স্বরে হান্নান ভাইকে বললেন, 'দেখাে, কবির ভাই (আমি) কেমন আমার বােনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক বছর থেকে এলে তুমিও তাে একই বিভাগে কাজ করাে, তােমার এত দিন চাকরি হলাে, তুমি তাে আমাকে কোথায় নিয়ে গেলে না!' হান্নান ভাই বললেন, ‘কবির ব্রিলিয়ান্ট অফিসার, ওর কথা আলাদা!' আমতা আমতা করে একটা জবাব দিয়ে বিষয়টি এড়াতে চাইলেন। স্ত্রী তাে দূরের কথা, অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ হান্নান ভাইয়ের সরকারি কাজে বিদেশে যেতেও প্রবল অনীহা ছিল।

জাতীয় রাজস্ব বাের্ডের সদস্য হিসেবে ভ্যাট প্রবর্তনের আগে একটি সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে ফিলিপাইন, ভারতসহ কয়েকটি দেশ সফরে গিয়েছিলেন। তাঁর সফরসঙ্গীরা আমাকে বলেছেন, তিনি প্রায়ই হােটেলের মূল খাবার বাদ দিয়ে ফলমূল ও ডেজার্ট খেয়ে থাকতেন। নিজের খাবারের জন্য তিনি দেশ থেকে সঙ্গে কিছু বিস্কুট নিয়ে গিয়েছিলেন।

হান্নান-বুলবুল দম্পতির বিদেশযাত্রী। তার বাসায় বেড়ানোর বছরখানেক পর আমি ব্রাসেলসে ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউসিও) একটি সভায় যােগ দিই। সেখানে তখন আমাদের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন আমার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী মনযুর মান্নান (পরে দুদকের সদস্য)। সেখানে মান্নান ভাইকে খাবার টেবিলে আপার আক্ষেপের কথা তুলে তাঁদের কীভাবে বিদেশে পাঠানো যায়, তা নিয়ে আলাপ করি। মান্নান ভাই বললেন, হান্নান ভাইয়ের স্ত্রীর আক্ষেপ সঠিক। সার্ভিসের আমরা সবাই নিজেও স্ত্রীসহ নানান দেশে সফর করেছি। আমরা দুজন আলাপ করে স্থির করি, ডৱিউসিওর মহাসচিব জাতীয় রাজস্ব বাের্ডের চেয়ারম্যান শাহ আবদুল হান্নানকে ব্রাসেলসে তাদের সদর দপ্তর ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানাবেন। ডব্লিউসিও তার সফরের সব ব্যয়ভার বহন করবে।

হান্নান-বুলবুল দম্পতি মান্নান ভাইয়ের বাসায় তাঁদের সঙ্গে থাকবেন। এই সুযােগে মিসেস হান্নান। একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। তবে নিমন্ত্রণপত্রটি আমার ঠিকানায় পাঠানাে হবে না হলে হান্নান সাহেবের হাতে সরাসরি গেলে তিনি না করে দেবেন। আমি তাদের সস্ত্রীক সফরে প্রধানমন্ত্রীর অনুমােদনের জন্য সারসংক্ষেপ তৈরি করে আমাদের নতুন চেয়ারম্যান শাহ আবদুল হান্নানের কাছে নিয়ে যাই। তিনি কোনােমতেই সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করতে রাজি হচ্ছিলেন না। এ সময় মান্নান ভাইও ব্রাসেলস থেকে তাকে ফোন করে বারবার আমন্ত্রণটি গ্রহণ করার জন্য অনুরােধ করেন। প্রায় এক ঘন্টা বসে থেকে, তর্কবিতর্ক করে, শেষমেশ বিরক্ত হয়ে তিনি সই করলেন। আমি সারসংক্ষেপ হাতে হাতে নিয়ে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া স্যারের কাছে যাই। তিনি কেবল একটি কথাই জিজ্ঞেস করলেন, 'হান্নান সাহেব কি বিদেশে যাবেন? তাকে তাে যখনই বিদেশ যাওয়ার কথা বলি, তিনি না করেন। আমি অর্থমন্ত্রীকে সবকিছু খুলে বললাম এবং জানালাম, অনেক কষ্টে আমি রাজি করিয়েছি। অর্থমন্ত্রী কী একটা কাজে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাচ্ছিলেন। বললেন, সারসংক্ষেপ তিনি নিয়ে যাবেন।

পরদিনই প্রধানমন্ত্রীর অনুমােদনসহ সারসংক্ষেপ চেয়ারম্যানের কাছে ফিরে এলে আমার ডাক পড়ে। আগেরবার রাগের মাথায় পুরাে সারসংক্ষেপ পড়েননি। এবার পড়েছেন, বললেন, 'ব্রাসেলসে তােমার আপার কাজ কী? তাঁর বিমান ভাড়া, থাকা-খাওয়ার খরচ কে দেবে?' আমি বললাম, 'বাংলাদেশ বিমান পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে আপনার স্ত্রী ১০ শতাংশ ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারেন। আর ব্রাসেলসে আপনারা মান্নান ভাইয়ের বাসায় থাকবেন।' তিনি নিমরাজি হলেন। সমস্যা হলাে, তাদের বাসায় বিদেশে যাওয়ার কোনাে ভালাে ব্যাগ নেই। টিনের বাক্স আছে, তা নিয়ে তাে আর ব্রাসেলসে যাওয়া যায় না! আমরা সদ্য বিদেশ ফেরত। সুটকেস, ট্রলি সবই আমাদের আছে। তাদের বাসায় পৌছে দিলাম। আমাদের পরিকল্পনা সফল হলাে, হান্নান-বুলবুল দম্পতি বিদেশ সফর করে ফিরে এলেন।

উত্তর গোড়ান থেকে অনেকবার আমি এবং অন্য অনেকে তাকে রাজউকের জমির জন্য আবেদন করতে বলেছেন। তিনি বারবারই বলেছেন, 'ঢাকায় আমার এজমালি হলেও একটি পৈতৃক সম্পত্তি আছে। আমি মিথ্যা ঘােষণা স্বাক্ষর করতে পারব না। তা ছাড়া আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়ার ও কিস্তির ঢাকাই-বা আমি কোথা থেকে দেব?' আমরা রাজউকের দুজন চেয়ারম্যান ও পূর্তসচিবকে তাঁকে বলতে শুনেছি, 'স্যার, আপনি কেবল আবেদন করেন। বাকিটা আমরা দেখব।' তিনি কোন মতেই রাজি হননি। আর্থিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার যে নজির শাহ আবদুল হান্নান রেখে গেছেন, তা বিরল।

আমি ক্ষণজন্মা এই মানুষটির আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তাঁদের সন্তান ইমু ও ফয়সালের প্রতি সমবেদনা। তাদের বলি, এমন একজন মানুষকে পিতা হিসেবে পাওয়া যেকোনো সন্তানের জন্য একটি বিরল সম্মান। আর নিজেদের বলি, এমন একজন সরকারি কর্মকর্তা পাওয়া একটি জাতির জন্য ভাগ্যের বিষয়।

 

- লেখক: মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান

সাবেক সচিব ও অর্থনীতিবিদ।

তথ্যসূত্রঃ https://www.facebook.com/groups/545777542768229/permalink/759239744755340/?sfnsn=mo 

 

Saturday, May 29, 2021

ফিলিস্তিন-ইসরাইলের যুদ্ধ বিরতি এবং একটি পর্যালোচনা

ফিলিস্তিন-ইসরাইলের যুদ্ধ বিরতি এবং একটি পর্যালোচনা

ফিলিস্তিন-ইসরাইলের যুদ্ধ বিরতি এবং একটি পর্যালোচনা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

মিশর, কাতার ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বিরতির পর ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের বিমান হামলা এবং তাদের পদাতিক বাহিনীর আক্রমন থেমে গেছে।ইসরাইলের পদাতিক বাহিনী নিজেদের এলাকা থেকে গাজায় ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করলেও পূর্বের অন্যান্য যুদ্ধের মতো ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করার চেষ্টা তারা করেনি।ফিলিস্তিনের দুটি অংশ- জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকা, মধ্যখানে ইসরাইল।এক অংশের সাথে অন্য অংশের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার।ইসরাইলের উপর দিয়ে দুই এলাকার লোকদের চলাচল করতে হয়, তবে ইসরাইলি পুলিশের শারীরিক তল্লাশি ছাড়া নয়।জর্ডান নদী ও ডেড সী’র পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ এলাকাটি শাসন করছে ফিলিস্তিনের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল ফাতাহ বা পিএলও গোষ্ঠী।ইয়াসির আরাফাতের এই রাজনৈতিক দলটি সশস্ত্র সংগ্রাম পরিহার করে ১৯৯৩ সনে ইসরাইলের সাথে শান্তি চুক্তি করে।ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস পশ্চিম তীরের বিস্তৃর্ণ এলাকা শাসন করছেন, পৃথিবীর শতাধিক দেশ এই সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।বাংলাদেশেও তাদের দূতাবাস রয়েছে।কিন্তু গাজার ফিলিস্তিন দল হামাস এই শান্তি চুক্তি মানে না।অতি সম্প্রতি এই হামাসই ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ করেছে।

চমকপ্রদ বিষয় হলো, বর্তমান ফিলিস্তিন এলাকায় জেরুজালেম শহরটি মুসলমান, খ্রিস্টান এবং ইহুদি- এই তিন ধর্মাবলম্বীদের কাছেই পবিত্র।নবী ইব্রাহীম (আঃ) ছিলেন ইহুদী, খ্রিস্টান, মুসলমান- এই তিন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পিতা।ইরাকে জন্মগ্রহণকারী ইব্রাহীম(আঃ) ইরাক থেকে কেনান বা জেরুজালেমে হিজরত করেন এবং কেনানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।নবী ইব্রাহীম(আঃ) ও স্ত্রী সারার পুত্র হযরত ইসহাক(আ:) এবং তাঁর পুত্র ইয়াকুব (আঃ)-এর বংশধর হচ্ছে বনি ইসরাইল বা ইহুদিরা; ইমরান, মুসা, হারুন, দাঊদ, সুলায়মান, ঈসা প্রমুখ নবীগণ ছিলেন ইবরাহীমের পুত্র ইসহাকের বংশধর।অপরপক্ষে ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর অপর স্ত্রী হাজেরার পুত্র হযরত ইসমাঈল(আঃ)-এর বংশে জন্ম নেন হযরত মুহাম্মদ(সা.)।ইসমাঈল (আঃ) জন্ম কেনানে হলেও মা হাজেরাসহ তাঁকে মক্কায় নির্বাসনে পাঠানো হয়।

কেনান বা জেরুজালেমে যে আল আকসা মসজিদ বা উপসনালয় নিয়ে ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ তা প্রথম নির্মাণ করেন ফেরেস্তাগণ, পরে আদম(আ:) তা পুননির্মাণ করেন।নূহ (আ.)-এর প্লাবনে উপসনালয়টি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইব্রাহীম(আ.) আবার তা পুননির্মাণ করেন।তবে ইহুদিদের মতে দাউদ (আ:)-এর পুত্র নবী সুলায়মান (আ:) ইহুদিদের জন্য প্রথম এই উপাসনালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন; পরবর্তীতে এই উপসনালয়ের ধ্বংস এবং পুননির্মাণ চলতেই থাকে।৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেম মুসলমানদের অধীনে এলে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব(রা.) ইহুদিদের উপসনালয়ের ধ্বংসস্তুপের মধ্যে একটি মসজিদ তৈরি করেন।এই মসজিদটি পরবর্তীতে ভূমিকম্পে দুইবার ধ্বংস হয়ে গেলেও তৎকালীন মুসলিম শাসকেরা তা পুননির্মাণ করেন।১০৯৯ সনে খ্রিস্টান ক্রুসেডার বাহিনী জয়ী হলে তারা মসজিদসহ পুরো এলাকাকে প্রাসাদ এবং গির্জা হিসেবে ব্যবহার করেন।১১৮৭ সনে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি (র.) পুনরায় জেরুজালেম দখল করেন এবং গির্জাকে মসজিদে পরিবর্তন করেন।১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে তুর্কিরা জেরুজালমসহ ফিলিস্তিন এলাকা দখল করে নেয় এবং ১৯১৭ সন পর্যন্ত তা নিজেদের দখলে রাখতে সমর্থ হয়।প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয়ের পর বৃটেন ‘লিগ অব নেশস’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফিলিস্তিন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।

মন্দির, গির্জা, মসজিদ যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন এই স্থানে শুক্রবারে মুসলমান, শনিবারে  ইহুদি এবং রবিবারে খ্রিস্টানেরা সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনা করে থাকে।ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানগণ এই পবিত্র স্থানটি সম্পূর্ণভাবে নিজেদের জন্য এককভাবে পেতে চায়।কারণ আল আকসা মসজিদ মুসলমানদের প্রথম কেবলা এবং এখানে মুসলমানদের কুব্বাত আস সাখরা বা ইহুদিদের ডোম অফ দ্য রকের নিচে যে পাথরটি রয়েছে তাতে ভর রেখে হযরত মুহাম্মদ ( স.) উর্ধারোহন করেছিলেন।অন্যদিকে এই পাথরটিই ইহুদিদের মূল কিবলা; হযরত ওমর (রা:)-এর মসজিদ নির্মাণের পূর্বে সেখানে যে উপসনালয়টি ছিলো সেই উপসনালয়টি ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমানেরা ধ্বংস করলেও তার একটি দেয়াল এখনো অবশিষ্ট রয়েছে এবং এই দেয়ালটিই এখন ইহুদিদের উপসনার একমাত্র স্থান।এছাড়াও ইহুদি, খ্রিস্ট এবং ইসলাম ধর্মে স্বীকৃত নবী মুসা(আ.)সহ বহু নবীর কবর এই শহরে; এই শহরেই খ্রিস্টানদের যীশু খ্রিস্ট বা মুসলমানদের ঈসা নবী (আ:)’র জন্ম এবং এখানেই তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদীদের নির্বিচারে হত্যার পর ইহুদিদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র করার দাবী উঠে।এই দাবীর প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিন এলাকাটি দুই ভাগ করে ফিলিস্তিন ও ইহুদিদের জন্য দুটি পৃথক রাষ্ট্র করার সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে  গৃহীত হয়। ফিলিস্তিন ও আরব মুসলমানেরা এই সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানালেও ইহুদিরা জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫৫% ভূমিতে ১৯৪৮ সনের ১৪ মে তারিখে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়।জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৬৪টি দেশ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছে।ইহুদিরা বিশ্বাস করে, তাদের পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম এবং তাঁর বংশধরদের জন্য তোরাহ ধর্মগ্রন্থে যে পবিত্রভূমির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে সেই পবিত্র ভূমিতেই ইহুদিরা তাদের ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে।জেরুজালেম এখন ইসরাইলের দখলে থাকলেও উপসনালয়ের স্থানটি নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব নিজেদের হাতে রাখেনি, মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে।এইজন্য এখনো মুসলমানেরা আল আকসা মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারেন।

সারা পৃথিবীর সাধারণ মুসলমানের অনুভূতি হচ্ছে, সব মুসলিম দেশ এক হয়ে ইসরাইলকে নিশ্চিহ্ন করে দিক।এই চেষ্টাও কয়েকবার হয়েছে।১৯৪৮ সনের ১৪ মে তারিখে মাত্র ৭ লক্ষ অধিবাসী নিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা দেয়ার পরদিন ৫টি মুসলিম দেশ মিশর, ইরাক, লেবানন, জর্ডান এবং সিরিয়া একযোগে ইসরাইল আক্রমন করে, কিন্তু হেরে যায়, ইসরাইল আরও ভূমি দখল করে নেয়।১৯৫৬ সনে মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুল নাসের ক্ষমতায় এসেই ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরাইলের জন্য সুয়েজ খাল বন্ধ ঘোষণা করলে ইসরাইল মিশর আক্রমন করে মিশরের ভেতরে ঢুকে যায়।আন্তর্জাতিক চাপে ইসরাইল যুদ্ধ থামিয়ে দখল করা মিশরের ভূমি ছেড়ে দেয়।১৯৬৭ সনে মিশর, সিরিয়া, ইরাক এবং জর্ডান পুনরায় ইসরাইল আক্রমন করে, কিন্তু তারা মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে পরাজিত হয়, ইসরাইল গাজা উপত্যকা, মিশরের সিনাই মরুভূমি, সিরিয়ার গোলান মালভূমি, জর্ডানের পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়।১৯৭৩ সনে সিরিয়া এবং মিশর আবার একযোগে ইসরাইল আক্রমন করে; মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত যুদ্ধে হেরে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি, কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে নয়’।

কোন মুসলিম দেশ আর ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে বলে মনে হয় না।তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানকে নিয়ে অনেক মুসলমান নতুন করে খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু ১৯৪৯ সনে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া প্রথম মুসলিম দেশ হচ্ছে তুরস্ক।২০০৫ সনে এরদোগান ব্যবসায়ীদের এক বিরাট বহর নিয়ে ইসরাইল সফর করেন।২০১৮ সনে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলেও ইসরাইলের সাথে তুরস্কের এখনো ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে।অন্যদিকে সৌদি আরবের সাথে ইসরাইলের গোপন আঁতাত নিয়ে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা রয়েছে।মালয়েশীয়া দূর থেকে কড়া কড়া বিবৃতি দিলেও তাদের যুদ্ধ করার সুযোগ নেই।ইরান কিছুটা সক্রিয় হলেও ইসরাইলের সাথে এককভাবে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামার আর্থিক ও সামরিক শক্তি তাদের নেই।পাকিস্তানের ভাড়াটে সেনারা ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ নামে এক অপারেশনে জর্ডানে শত শত ফিলিস্তিনকে গুলি করে মেরেছে, পিটিয়ে জর্ডান থেকে তাড়ানোর পুরস্কার হিসেবে ভাড়াটে সেনাদলের প্রধান জিয়াউল হক জর্ডান থেকে খেতাব পেয়েছিলেন।জিয়াউল হককে পাকিস্তানে ‘ফিলিস্তিন হন্তারক’ হিসেবে গণ্য করা হয়।ইসরাইলের গোলার আঘাতে আহত ফিলিস্তিনরা এবার কোন চিকিৎসা পায়নি, কারণ মিশরের জান্তা সরকার তাদের দেশে ফিলিস্তিনদের প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে।সিভিল ওয়ারে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

ইসরাইলকে তাদের নিজস্বার্থে ফিলিস্তিনদের সাথে সমঝোতায় আসা উচিত।কারণ যে ফিলিস্তিনরা শুধু পাথর ছুঁড়ে এক সময় ইসরাইলি সেনাদের মোকাবিলা করতো, তারা আজ হাজার হাজার রকেট ছুঁড়ছে, তাদের হামলার ভয় ইসরাইলকে সব সময় আতঙ্কিত রাখে।এছাড়াও ফিলিস্তিনদের হামলা রুখতে ইসরাইলকে সর্বদা যুদ্ধাবস্থায় থাকতে হয়, প্রতিরক্ষার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।ফিলিস্তিদের রকেট হামলা রোধ করতে ইসরাইল যে ‘আয়রন ডোম’ তৈরি করেছে তা দিয়ে প্রতিটি নিক্ষিপ্ত গোলা আকাশে ধ্বংস করতে প্রায় ৮০ হাজার ডলার বা ৬৭ লক্ষ টাকা ব্যয় করতে হয়।সর্বোপরি ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার ২০% লোক ফিলিস্তিন মুসলমান, বাইরের ফিলিস্তিনিরা আক্রান্ত হলে ইসরাইলের অভ্যন্তরে ফিলিস্তিন মুসলমান ও কট্টর ইহুদিদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়; বর্তমানে এই সংঘাত ইসরাইলের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।শক্তিশালী ইসরাইলকে তাদের স্বস্তি এবং শান্তির জন্য তাই ফিলিস্তিনিদের সাথে সমঝোতা করে ১৯৬৭ সনের পূর্বের সীমানায় ফেরত যাওয়া সমীচীন হবে।অন্যদিকে ইসরাইলের সাথে ফিলিস্তিন ও মুসলিম দেশগুলোর সমঝোতাই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত।কারণ ফিলিস্তিনদের  দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে গঠিত পিএলও ইতোমধ্যে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করে লড়াই থামিয়ে দিয়ে ২৩৯০ বর্গ কিলোমিটারের পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিন সরকার গঠন করেছে।অন্যদল হামাস শান্তিচুক্তি না মানলেও তাদের পক্ষে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয় পাওয়া সম্ভব হবে না।কারণ তাদের নিয়ন্ত্রিত মাত্র ৩৬০ বর্গ কিলোমিটারের গাজা উপত্যকা অনেকটা ইসরাইল দ্বারা অবরুদ্ধ, ইসরাইলের বাধার কারণে হামাসকে কেউ প্রকাশ্যে অস্ত্র সরবরাহ করতেও পারে না।জর্ডান এবং মিশর বহু বছর আগেই ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছে।সম্প্রতি আরও কয়েকটি মুসলিম দেশ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে, আরও কয়েকটি দেশ গোপনে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে।এখন ইসরাইলের বিরুদ্ধে যোদ্ধা শুধু পৃথিবীর সাধারণ মুসলমান ও হামাস।পৃথিবীব্যাপী সাধারণ মুসলমানেরা বিগত ৭৩ বছর যাবত প্রতিদিন নামাজের মোনাজাতে, প্রতি শুক্রবারে, ইদের নামাজে ইহুদিদের ধ্বংস আর ফিলিস্তিনিদের মুক্তির জন্য প্রার্থনা করে যাচ্ছে।কিন্তু কোনভাবেই ‘অভিশপ্ত’ ইহুদি জাতির রাষ্ট্র ইসরাইলের অস্তিত্ব মুছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।তাই ইসরাইল রাষ্ট্র ও ইহুদিদের ভূমধ্যসাগরে ডুবানোর অবাস্তব স্বপ্ন বাদ দেয়াই শ্রেয়।আর যদি ইসরাইলের অস্তিত্ব মুছে দিতে হয় তাহলে মুসলমানদের আধুনিক জ্ঞান-গরিমায় সমৃদ্ধ হতে হবে, অস্ত্র তৈরির কৌশল জানতে হবে, অথবা ঈসা নবী ও ইমাম মেহেদীর আসা পর্যন্ত মুসলমানদের অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক

ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের

সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com